নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার :
পর্যটন নগরী কক্সবাজারের হোটেলগুলোতে পর্যটকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং গোপনীয়তা কতটা সুরক্ষিত? সম্প্রতি এক বিতর্কিত রাজনীতিবিদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ভাইরালের ঘটনা এই প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। একটি অভিজাত হোটেলে অবস্থানকালে ব্যারিস্টার ফুয়াদের (ছদ্মনাম) আপত্তিকর ছবি গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে হোটেলেরই এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত হোটেল কর্মচারী এবং তার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত এক স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা পলাতক রয়েছেন। এই ঘটনাটি নিছক ব্যক্তিগত আক্রোশ, নাকি এর পেছনে রয়েছে ব্ল্যাকমেইলিং বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কোনো চক্র তা নিয়ে চলছে গভীর অনুসন্ধান।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত সপ্তাহে ব্যারিস্টার ফুয়াদ তার ব্যক্তিগত কাজে কক্সবাজার সফরে আসেন এবং শহরের কলাতলী এলাকার একটি নামকরা হোটেলে ওঠেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই হোটেলের রুম সার্ভিস বয় হিসেবে কর্মরত জিসান (ছদ্মনাম) কৌশলে বাথরুমের ভেন্টিলেটর বা অন্য কোনো গোপন স্থানে মোবাইল ক্যামেরা স্থাপন করে ব্যারিস্টার ফুয়াদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করে। পরবর্তীতে সেই ভিডিও এবং স্থিরচিত্রগুলো ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে যায় এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত হোটেল কর্মচারী জিসানের বাড়ি মহেশখালী উপজেলায়। সে প্রায় ছয় মাস ধরে ওই হোটেলে কর্মরত ছিল। তবে তার মূল সহযোগী হিসেবে যার নাম উঠে আসছে, তিনি হলেন স্থানীয় ওয়ার্ড ছাত্রলীগের নেতা পরিচয়দানকারী আরমান । অভিযোগ রয়েছে, আরমানের নির্দেশেই জিসান এই ভিডিও ধারণ করে এবং পরবর্তীতে আরমানই সেই ভিডিও বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। পুলিশের ধারণা, ব্যারিস্টার ফুয়াদকে সামাজিক ভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা অথবা ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেওয়াই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হোটেলের এক কর্মচারী জানান, “জিসান ছেলেটা শান্তশিষ্ট থাকলেও আরমানের সাথে তার বেশ ওঠাবসা ছিল। আরমান প্রায়ই হোটেলে আসত এবং তাদের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ ধরে আলাপ-আলোচনা চলত।” ঘটনাটি নজরে আসার পর ব্যারিস্টার ফুয়াদের পক্ষ থেকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার পর থেকেই জিসান ও আরমান পলাতক রয়েছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, “আমরা অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে। প্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। আমরা আশা করছি, দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই চক্রের সাথে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা, কিংবা অতীতেও তারা এ ধরনের অপরাধ করেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
এই ঘটনায় হোটেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কীভাবে একজন কর্মচারী হোটেলের কক্ষে গোপন ক্যামেরা স্থাপনের সুযোগ পেল, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেনি। হোটেলটির ব্যবস্থাপক (কর্তৃপক্ষের অনুরোধে নাম অপ্রকাশিত) বলেন, “এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও লজ্জাজনক ঘটনা। আমরা ঘটনার পরপরই অভিযুক্ত কর্মচারীকে বরখাস্ত করেছি এবং পুলিশকে তদন্তে সর্বাত্মক সহযোগিতা করছি। আমরা আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করছি এবং ভবিষ্যতে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা হবে।”তবে, কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এই ঘটনাকে পুরো পর্যটন শিল্পের জন্য একটি অশনি সংকেত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের একটি ঘটনা আমাদের সবার জন্য বিব্রতকর। এতে পর্যটকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে। আমরা সকল হোটেল মালিকদের কর্মচারী নিয়োগের পূর্বে তাদের পরিচয় ও অতীত রেকর্ড ভালোভাবে যাচাই (Police Verification) করার জন্য নির্দেশনা দিয়েছি।”
ব্যারিস্টার ফুয়াদের ছবি ভাইরালের এই ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি কক্সবাজারের মতো একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্রের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক এখানে আসেন প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং সাময়িক অবসরে নিজেদের মতো করে সময় কাটাতে। তাদের আস্থার জায়গা হলো হোটেলের সুরক্ষিত কক্ষ। সেই আস্থায় যদি চিড় ধরে, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো পর্যটন অর্থনীতিতে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি হোটেলগুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।