জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক উল্কার মতো আবির্ভাব ঘটেছিল শরীফ ওসমান হাদীর। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র এবং জুলাই বিপ্লবের সম্মুখসারির এই নেতা কেবল একজন ছাত্রনেতা ছিলেন না, বরং তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক নতুন রাজনৈতিক দর্শনের প্রবক্তা। তাঁর সংক্ষিপ্ত কিন্তু প্রভাববিস্তারি রাজনৈতিক জীবনকে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে।
১. জুলাই বিপ্লবের ‘জান’ ও ত্যাগের রাজনীতি:
শরীফ ওসমান হাদী জুলাই বিপ্লবকে কেবল একটি ক্ষমতা বদলের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি, বরং একে একটি আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। স্লোগান ও চেতনা: তাঁর দেওয়া “জান দেব, জুলাই দেব না” স্লোগানটি বিপ্লবীদের মধ্যে ত্যাগের এক চরম পরাকাষ্ঠা তৈরি করেছিল।
সতর্কবার্তা:
তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, বিপ্লব ব্যর্থ হলে শহীদদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে। এই দূরদর্শী চিন্তা থেকেই তিনি ‘দ্বিতীয় বিপ্লবের’ প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান।
২. রাজনৈতিক ভাবধারা: ইনসাফ ও জাতীয়তাবাদ: হাদীর রাজনৈতিক চিন্তা ছিল ত্রিমাত্রিক—ধর্মীয় নৈতিকতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচার।
ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র: তিনি প্রচলিত গণতন্ত্রের চেয়ে ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ওপর জোর দিতেন।
সার্বভৌমত্ব ও পররাষ্ট্রনীতি: ভারতের প্রতি তাঁর কঠোর অবস্থান ছিল। “পড়োসী চাই, মালিক নয়”—এই বার্তার মাধ্যমে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সমমর্যাদার সম্পর্কের দাবি তুলেছিলেন, যা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।
জাতীয় সরকার: তিনি বিএনপি-জামায়াতসহ সব ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তিকে নিয়ে একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যাতে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে।
৩. প্রচলিত রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ ও সমালোচনা:
হাদী ছিলেন প্রচলিত রাজনৈতিক ধারার একজন কড়া সমালোচক। তিনি মনে করতেন, পুরনো দলগুলো সংস্কারের চেয়ে ক্ষমতার দিকে বেশি মনোযোগী।
আওয়ামী লীগ: দলটিকে ফ্যাসিবাদের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি এর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণের দাবি জানিয়েছিলেন।
বিএনপি ও জামায়াত: তিনি বিএনপিকে “পুরনো ধারার” রাজনীতির জন্য সতর্ক করেছিলেন এবং জামায়াতকেও জনবিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ‘জুলাই মানসিকতা’ ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর ভয় ছিল, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে দেশ আবার পুরোনো চক্রে ফিরে যাবে।
৪. ইনকিলাব মঞ্চ ও সাংস্কৃতিক লড়াই:
শরীফ ওসমান হাদী অনুধাবন করেছিলেন যে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য সাংস্কৃতিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
সাংস্কৃতিক বিপ্লব: ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের মাধ্যমে তিনি জুলাইয়ের স্মৃতি এবং বিপ্লবের চেতনাকে জীবন্ত রাখার চেষ্টা করেন।
নির্বাচনী মডেল: ঢাকা-৮ বা ঢাকা-১০ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাঁর প্রচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো। জনগণের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং ‘মুড়ি-বাতাসা’ খেয়ে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়া—এটি ছিল প্রচলিত ‘টাকা ও পেশিশক্তির’ রাজনীতির বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদ।
৫. রূপক ও প্রতীকী ভাষার ব্যবহার:
হাদীর বক্তব্য সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল তাঁর রূপকধর্মী ভাষা।
মৃত্যুর রূপক: “ফ্যাসিবাদের কবর খনন” বা “ইনসাফের যোদ্ধা”—এই শব্দগুলো রাজনীতিকে একটি নৈতিক যুদ্ধে রূপান্তরিত করেছিল।
আবেগীয় সংযোগ: তাঁর বিনয়ী আচরণ এবং “মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর” শিক্ষা প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যেও প্রতিফলিত হয়েছে।
৬. ষড়যন্ত্র ও শাহাদাত:
তাঁর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান তাঁকে অনেক মহলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।
হামলা ও মৃত্যু: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫-এ পল্টনে তাঁর ওপর হওয়া হামলা এবং ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে।
শেষ বিদায়: ২০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর জানাজা এবং জাতীয় কবির মাজারের পাশে তাঁর সমাধি এই বার্তাই দেয় যে, রাষ্ট্র তাঁকে একজন ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন জুলাই বিপ্লবের সেই অতন্দ্র প্রহরী, যিনি চেয়েছিলেন রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে। তাঁর রাজনীতি ছিল মূলত যুবশক্তি, ইনসাফ এবং সার্বভৌমত্বের সংমিশ্রণ। তাঁর মৃত্যুতে যে বিশাল জনস্রোতের ক্ষোভ জানাজায় ইতিতাসে এত মানুষ অংশগ্রহণে নজির নাই। এটাই প্রমাণ করে যে তাঁর আদর্শ কেবল ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল না, বরং তা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ছিল।
সম্পাদকীয় :
গোলাম সারোয়ার
সম্পাদক, দৈনিক বাংলা প্রতিদিন।