এস এম মাসুদ :
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ফসলি জমির মাটি লুটের চেষ্টাকালে এলাকাবাসীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে ভেকু (এস্কেভেটর) ফেলে পালিয়েছে একটি প্রভাবশালী মাটিখেকো সিন্ডিকেট। সোমবার (৫ জানুয়ারি) গভীর রাতে উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বরকান্দি গ্রামের গাবতলী বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মাটি কাটায় ব্যবহৃত ভেকুটি জব্দ করে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার রাতে বরকান্দি গ্রামের বাসিন্দা মাইনুদ্দিনের ফসলি জমি থেকে জোরপূর্বক মাটি কাটা শুরু করে একটি প্রভাবশালী চক্র। জমির মালিক ও স্থানীয়রা বাধা দিলে তা তোয়াক্কা না করে আবাদি জমির ওপর দিয়েই ভারী ড্রাম ট্রাক চালিয়ে মাটি পরিবহন করতে থাকে তারা। এতে বোরো আবাদের জন্য প্রস্তুত করা জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। একপর্যায়ে গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুললে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অভিযুক্তরা সরঞ্জাম ফেলে পালিয়ে যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই মাটি চুরির নেপথ্যে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের অন্যতম সদস্য চান মিয়ার ছেলে আবুল বাশার। বাশারের ফুফা ৯নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম হাসি পূর্বে এই ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও বাশার তার দলবল নিয়ে পুরো ইউনিয়নের মাটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। সিন্ডিকেটের অপর প্রভাবশালী সদস্য হলেন সনমানিয়ার কানন। তিনি প্রভাব খাটিয়ে এককভাবে মাদুলি বিল এলাকা থেকে নিয়মিত মাটি লুটে জড়িত। জানা যায়, কাননের আপন ভায়রা তপন সনমানিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং তার শ্বশুর সিরাজ উদ্দিন বিএসসি। এই রাজনৈতিক যোগসূত্রকে কাজে লাগিয়ে কানন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছেন।
সিন্ডিকেটের অন্য সদস্য ছফুর উদ্দিনের ছেলে আলামিন, যার চাচা সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত মাস্টার এক সময় এই ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রক ছিলেন। এখন আলামিন সেই আধিপত্য ধরে রেখেছেন। এছাড়াও রয়েছেন ‘মূর্খ কামাল’ হিসেবে পরিচিত গিয়াস উদ্দিন সরকারের ছেলে এবং সনমানিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে সাইদুর রহমান ফকির লিটন। এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কৃষকদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোটি কোটি টাকার মাটির বাণিজ্য করছে। তাদের ভয়ে সাধারণ মানুষ কথা বলার সাহস পায় না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মাইনুদ্দিন, বাদল ও শাহীন বলেন, “আমাদের আবাদি জমির ওপর দিয়ে জোর করে ড্রাম ট্রাক চালানো হয়েছে। বোরো চাষের জন্য জমি প্রস্তুত করেছিলাম, এখন সব শেষ। এভাবে জমি নষ্ট করলে আমরা না খেয়ে মরব। আমরা এই সন্ত্রাসীদের বিচার চাই।”কাপাসিয়ায় অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর নড়েচড়ে বসেছে উপজেলা প্রশাসন। বর্তমানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় বরকান্দির ঘটনায় ভেকুটি জব্দ করা হয়েছে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।