নিজস্ব প্রতিবেদক :
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় কর্মরত সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইনের বিরুদ্ধে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, দুর্নীতি ও নানা প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার বাসিন্দা মো. জাবেদ আলম।
জানা যায় রাশেদ হোসাইন ২০২১ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর থেকে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে নিয়মনীতির উপেক্ষা করে সাধারণ জমির মালিকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অর্থ আদায় করে আসছেন। অভিযোগকারীর দাবি, শ্যামনগর ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার সফিপুর এলাকায় প্রায় সাত শতাংশ জমির ওপর কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ছয় তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটি পৌরসভার অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাশেদ হোসাইনের নামে ও বেনামে বিভিন্ন এলাকায় একাধিক জমি ও সম্পত্তি রয়েছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে জনমনে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের বক্তব্য :
কালিয়াকৈর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আক্তার হোসেন বলেন, সফিপুর এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে আবুল হোসেন ( পিতা ইসহাক ) নামে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে আমি চিনি না। একই এলাকার ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আহাদ আলী বলেন, এখানে বাইরে থেকে এসে অনেকেই বসবাস করেন। এই নামে কোনো মুক্তিযোদ্ধা আছেন কিনা, নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।
ভূয়া মুক্তিযুদ্ধার সনদে চাকুরী :
মুক্তিযোদ্ধার কোটায় এবং আওয়ামী ফ্যাসিষ্ট সরকারের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সুপারিশে বিগত ২০২১ সালে ৩৮ তম বিসিএস ক্যাডার হিসেবে রাশেদ হোসাইনের চাকরি হয়। রাশেদ হোসাইন নিজেকে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে দাবি করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব খাটিয়ে একই উপজেলায় দীর্ঘদিন কর্মরত রয়েছেন। তবে স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, তার পিতা প্রকৃতপক্ষে বীর মুক্তিযোদ্ধা কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছেন তারা।
সিন্ডিকেটে চলে এসিল্যান্ড ;
কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন গড়ে তোলেছেন একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর এসিল্যান্ড অফিসে।এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে প্রতিনিয়ত হয়রানি, দুর্নীতি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সেবাগ্রহীতারা। সেখানে অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ দেয়ার পরও কাজ হচ্ছে না।
ভূমি অফিস থেকে সেবা :
সে নিজে সবসময় সেবাগ্রহীতাদের বলে থাকেন, “জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ভূমি সংক্রান্ত দুর্নীতি রোধ করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। শ্যামনগরের মানুষ যেন সহজে ভূমি অফিস থেকে সেবা পায়, তা নিশ্চিত করতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।” কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো টাকা ছাড়া মেলানা কোন সেবা।
গ্রামের বাড়ি বাসাইল :
তার পিতা আবুল হোসেন জন্ম স্থান ও বাড়ি পার্শ্ববর্তী জেলা টাঙ্গাইলের বাসাইল থানার কাশিল ইউনিয়নের কাশিল গ্রামে। ঐ গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন পিতা আব্দুল মালেক নামে একজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন। কিন্তু আবুল হোসেন পিতা ইসহাক মিয়া গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার ৬১ নং তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। এই বিষয়ে একাধিক স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন রাশেদ হোসাইনের পিতা আবুল হোসেন মুক্তিযোদ্ধা কিনা তারা তাকে ভালো করে চিনেন না।
এলাকাবাসীর বক্তব্য :
টাঙ্গাইলের কাশিল গ্রামের উপস্থিত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকাবাসী সাংবাদিকদের জানান, সহকারি কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন ও তার পিতা মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসাইন তার পিতা ইসহাক নামে কোন ব্যক্তিকে অত্র গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ বা ব্যক্তিগতভাবেও চিনেন না।এই গ্রামে কখনো কোথাও তাদের বসবাস ছিল না। এলাকাবাসীর দাবি আগে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঠিকানা ব্যবহার করে যদি কোন ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত করা হয় অন্য ঠিকানায় আর সেই বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধার কোঠায় যদি কারোও সরকারি চাকরি হয়ে থাকে তার বিরুদ্ধে এবং বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্থক্ষেপ কামনা করেন।
কালিয়াকৈর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী :
কালিয়াকৈর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মোতালেব বলেন, শফিপুর এলাকায় প্রায় সাত শতাংশ জমির ওপর একটি ছয়তলা ভবন নির্মাণের বিষয়ে আমরা অবগত হয়েছি। তবে পৌরসভা থেকে এ জন্য কোনো ধরনের অনুমোদন বা প্ল্যান পাস নেওয়া হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
রাশেদ হোসাইনের বক্তব্য :
সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন বলেন, বাড়িটি পারিবারিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে পরিবারের সবার অর্থ রয়েছে। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধও জানান।