নিজস্ব প্রতিবেদক :
সম্প্রতি দেশের ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও ডিজেলের এক নজিরবিহীন সংকট লক্ষ্য করা গেছে। দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও সাধারণ মানুষকে জ্বালানি তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হয়েছে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে এবং প্রতিটি স্টেশনে নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এই হঠাৎ সংকট এবং হঠাৎ তা স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া একটি পরিকল্পিত ‘কৃত্রিম সংকট’ এর দিকেই ইঙ্গিত করে।
কৃত্রিম সংকটের নেপথ্যে অসাধু চক্র
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই সংকটের পেছনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী মহলের হাত ছিল। যখন বাজারে তেলের সরবরাহ কিছুটা কমেছে, তখন ফিলিং স্টেশনগুলো সেই সুযোগকে পুঁজি করে কৃত্রিম ভাবে ‘স্টক নেই’ বলে সাধারণ গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিয়েছে। মূলত বেশি দামে তেল বিক্রি এবং অনৈতিক মুনাফা লাভের লক্ষ্যেই এই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল।
মিটার টেম্পারিং ও অবৈধ মুনাফা
কৃত্রিম সংকটের সময় ফিলিং স্টেশনগুলো বিশেষ কায়দায় মিটার টেম্পারিং বা কারচুপির আশ্রয় নিয়েছিল। ২০ টাকা অতিরিক্ত প্রফিট: প্রতি লিটার তেলে কারচুপির মাধ্যমে ফিলিং স্টেশনগুলো গড়ে ২০ টাকা পর্যন্ত অবৈধ মুনাফা করেছে। ওজনে কম দেওয়া মিটারে এক রিডিং দেখালেও বাস্তবে গ্রাহকের ট্যাঙ্কে কম তেল সরবরাহ করা হয়েছে। সংকটের কারণে মানুষ তাড়াহুড়ো করে তেল নিতে গিয়ে মিটারের সূক্ষ্ম কারচুপি ধরার সুযোগ পায়নি।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ‘ভিআইপি’ কালচার
সংকটকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ যখন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল, তখন এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা সেই শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছেন।
বাইক সিন্ডিকেটকে এক একজন নেতা ২০ থেকে ২৫ টি বাইক নিয়ে এসে সিরিয়াল ভেঙে পেট্রোল দিতে দেখা গেছে। বখশিস ও কালোবাজারি সাধারণ গ্রাহকের জন্য তেল নেই বলা হলেও, ৫০০ টাকার পেট্রোল দেওয়ার বিনিময়ে প্রভাবশালীরা ৭০০ টাকা পর্যন্ত পরিশোধ করেছেন। অর্থাৎ লিটার প্রতি নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে তারা তেল সংগ্রহ করেছেন।
তেল সরবরাহকারী কর্মীদের কারসাজি
ফিলিং স্টেশনের তেল সরবরাহকারীরাও (পাম্প অপারেটর) এই সুযোগে গ্রাহকদের ঠকিয়েছেন। লাইনে কয়েকশ বাইক দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ নিয়ে তারা দ্রুত তেল ভরার নাটক সাজাতেন।গ্রাহক ৫০০ টাকার তেল চাইলে তারা ৩৫০ বা ৪০০ টাকার তেল দিয়েই পাম্প বন্ধ করে দিতেন। পিছনে প্রচুর বাইকের ভিড় থাকায় এবং চাপের মুখে সাধারণ মানুষ মিটারের রিডিং মিলিয়ে দেখার সময় পেতেন না। এভাবে বাকি ১০০-১৫০ টাকা সরাসরি পাম্পের পকেটে বা অপারেটরের ব্যক্তিগত তহবিলে চলে যেত।
বর্তমান পরিস্থিতি
আচমকা সংকটের অবসান ঘটিয়ে এখন প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে পর্যাপ্ত পেট্রোল ও ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হয় যে বাজারে তেলের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও একটি গোষ্ঠী অধিক মুনাফার লোভে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিএসটিআই (BSTI) এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত আকস্মিক অভিযান চালিয়ে মিটার পরীক্ষা করলেই রহস্য উদঘাটন হবে।