গোলাম সারোয়ার : কাপাসিয়া।
সময় বয়ে যায় তার নিজস্ব নিয়মে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে চার জানুয়ারি থেকে আজ জুনের দশ তারিখ— দেখতে দেখতে কেটে গেল দীর্ঘ ৫ মাস ৬ দিন। কিন্তু কিছু শূন্যতা এমন হয়, যা সময়ের কোনো হিসেব দিয়েই পূরণ করা যায় না। কাপাসিয়ার প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় শিক্ষক গোলাম মোস্তফা মাষ্টার সাহেবের মৃত্যুর পর আজ তাঁর পরিবারের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে এক গভীর একাকীত্ব আর পিতৃচ্ছায়ার অভাব বুকে নিয়ে।
একটি বিশেষ কাজে আজ গাজীপুর শহরে অবস্থানকালে জোহরের আজানের সুমধুর ধ্বনি যখন কানে ভেসে আসছিল, তখনই হঠাৎ বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। এক অদ্ভুত নীরবতা যেন গ্রাস করে চারপাশ। মনে পড়ে গেল এক চিরচেনা অভ্যাসের কথা। এতদিন কোনো প্রয়োজনে বা কাজে কাপাসিয়া ছেড়ে গাজীপুর কিংবা ঢাকায় এলেই জোহরের আজানের ঠিক আগমুহূর্তে একটি ফোন আসত। ওপাশ থেকে ভেসে আসত অতি পরিচিত, অতি আপন সেই কণ্ঠস্বর— “কোথায় আছিস? কী খবর তোর? ঠিকঠাক পৌঁছেছিস তো?”
আজও আজানের শব্দ শুনে অবচেতন মনেই হাতটা চলে গিয়েছিল পকেটে থাকা ফোনটার দিকে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি স্ক্রিনে ভেসে উঠবে ‘আব্বা’ লেখাটি। কিন্তু পরক্ষণেই রূঢ় বাস্তবতা এসে সজোরে আঘাত করল মনে— আব্বাতো আর নেই! ওপাশ থেকে খোঁজ নেওয়ার মানুষটি আজ দুনিয়ার সব মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন ওপারে, যেখানে কোনো মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক পৌঁছায় না।
আজকের এই তপ্ত দুপুরে গাজীপুরের বুকে দাঁড়িয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হলো বাবার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর ছায়ার মতো আগলে রাখার আকুলতা। বাবা মানে যে এক বিশাল বটবৃক্ষ, যার উপস্থিতিতে কোনো ঝড়-ঝাপটা সন্তানকে স্পর্শ করতে পারে না, তা আজ প্রতি পদে পদে স্পষ্ট হচ্ছে।
সন্তানের প্রতি বাবার এই যে নিখাদ উদ্বেগ, এই যে প্রতি বেলা খোঁজ নেওয়া— এ তো শুধু একটা ফোন কল ছিল না; এ ছিল এক পরম নিশ্চিত আশ্রয়। আজ সেই আশ্রয় নেই, আজ জোহরের আজান পড়ে ঠিকই, কিন্তু ফোনটা আর বেজে ওঠে না।
গোলাম মোস্তফা মাষ্টার সাহেব শুধু একজন আদর্শ শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন একজন শ্রেষ্ঠ অভিভাবক। তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি আর নীতি আদর্শ আজীবন তাঁর সন্তানদের পথ দেখাবে। নিখাদ এই অভিভাবকত্ব হারানোর বেদনা কোনোদিন মুছে যাওয়ার নয়। পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন। আমীন।
